চীনে চাহিদা কমছে

তামার আন্তর্জাতিক বাজারে যুক্তরাষ্ট্র-ভারতের প্রভাব বাড়ছে

বিশ্বে ধাতব পণ্য ব্যবহারে শীর্ষ দেশ চীন। দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশটির শিল্প ও অবকাঠামো খাতের বিস্তার তামার বৈশ্বিক বাজারকে ব্যাপক মাত্রায় প্রভাবিত করেছে।

বিশ্বে ধাতব পণ্য ব্যবহারে শীর্ষ দেশ চীন। দীর্ঘ দুই দশক ধরে দেশটির শিল্প ও অবকাঠামো খাতের বিস্তার তামার বৈশ্বিক বাজারকে ব্যাপক মাত্রায় প্রভাবিত করেছে। ২৫ বছর আগে প্রতি টন তামার দাম ছিল প্রায় ১ হাজার ৫০০ ডলার, যা এখন ১০ হাজার ডলার ছাড়িয়েছে। তবে উৎপাদন খাতের মন্থরতায় দেশটিতে এখন তামার চাহিদা অনেকটাই কমে এসেছে। এর বিপরীতে বিশ্বের শীর্ষ অর্থনীতি যুক্তরাষ্ট্র ও পঞ্চম অর্থনীতি ভারতে ধাতুটির ব্যবহার এখন ক্রমেই বাড়ছে। বাজার বিশ্লেষকরা বলছেন, আগামী এক দশকে বৈশ্বিক তামার বাজারে অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে দেশ দুটির ক্রমবর্ধমান চাহিদা। খবর রয়টার্স।

ইউরোপভিত্তিক শেয়ারবাজার ও কমোডিটি বিশ্লেষণী প্রতিষ্ঠান প্যানমিউর লিবারামের বিশ্লেষক টম প্রাইস জানান, এর আগে তামার দাম বাড়া-কমা নির্ভর করত মূলত বিদ্যমান অবকাঠামো মেরামত, প্রতিস্থাপন ও আধুনিকায়নের ওপর। কিন্তু দুই দশক ধরে চীনের নতুন অবকাঠামো নির্মাণ ও শিল্প সম্প্রসারণই ছিল বৈশ্বিক তামার চাহিদার প্রধান উৎস। বর্তমানে দেশটির সেই দ্রুত সম্প্রসারণ ধীর হচ্ছে। ফলে বাজারে আবার চীনের বাইরের দেশগুলোর ব্যবহারের তথ্য তামার চাহিদা কমা বা বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখবে।

বাজার বিশ্লেষকরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ স্থানীয় উত্তোলন উৎসাহিত করতে বিভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছে। তাই সামনের দিনগুলোয় চীনের উত্তোলন ও রফতানি কার্যক্রম কিছুটা ধীর হয়ে উঠতে পারে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) খাতের জন্য ডাটা সেন্টার স্থাপন ও বিদ্যুৎ গ্রিড উন্নয়ন প্রকল্পগুলোও চীনের বাইরের দেশগুলোয় তামার চাহিদা বাড়াচ্ছে।

টম প্রাইসের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালের তুলনায় ২০৩১ সালে চীনে ধাতব পণ্যটির চাহিদা ৬ শতাংশ কমে যাবে। ২০২৬ সালে বিশ্বের মোট অপরিশোধিত তামা ব্যবহারে চীনের হিস্যা থাকতে পারে ৫৭ শতাংশ। ২০৩১ সালে তা ৫২ শতাংশে নেমে আসবে। সে সময় মোট ব্যবহারের পরিমাণ হতে পারে ২ কোটি ৭০ লাখ টন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রে তামার চাহিদা প্রায় ৫০ শতাংশ বেড়ে ২২ লাখ টনে পৌঁছতে পারে। এছাড়া ভারতের চাহিদা ৩০ শতাংশ বেড়ে ১০ লাখ টনের বেশি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন সম্প্রতি তামার পাইপ ও তার আমদানিতে ৫০ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। এতে দেশটিতে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন বাড়বে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা, যার প্রভাব পড়বে চীনের রফতানিতে।

আন্তর্জাতিক বাণিজ্য বিশ্লেষণী সংস্থা ট্রেড ডাটা মনিটরের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র চীনের তামার পাইপ রফতানির চতুর্থ শীর্ষ গন্তব্য। গত বছর দেশটি চীন থেকে ১ কোটি ৪৪ লাখ টন তামার টিউব ও পাইপ আমদানি করেছিল। চলতি বছরের প্রথম সাত মাসেই আমদানি হয়েছে প্রায় ৮০ লাখ টন।

এ বিষয়ে কনকর্ড রিসোর্সেসের গবেষণা পরিচালক ডানকান হবস বলেন, ‘পশ্চিমা দেশগুলোর বাড়তি প্রতিরোধমূলক নীতির কারণে চীনের উৎপাদন ও রফতানি কিছুটা মন্থর হবে।’

সংশ্লিষ্টরা জানান, যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যুৎ সঞ্চালন নেটওয়ার্কের ৭০ শতাংশ লাইন ২৫ বছরের বেশি পুরনো, যা আধুনিকায়নের সময় এসেছে। অন্যদিকে ভারত ২০৩০ সালের মধ্যে ৫০০ গিগাওয়াট নবায়নযোগ্য শক্তি সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্যে বিদ্যুৎ সঞ্চালন অবকাঠামো সম্প্রসারণে বিনিয়োগ করছে।

পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বেঞ্চমার্ক মিনারেল ইন্টেলিজেন্সের পূর্বাভাস অনুযায়ী, চীনের বাইরে এশিয়ার অন্যান্য দেশে ২০২৫ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে তামার চাহিদা ২৫ শতাংশ বেড়ে ৯২ লাখ টনে পৌঁছবে। বিদ্যুৎ ও টেলিকম অবকাঠামো খাতে চাহিদা বাড়বে ৩৫ শতাংশ। এ সময় মোট চাহিদা পৌঁছতে পারে ২২ লাখ টনে।

মেটালস কনসালট্যান্সি সিআরইউর প্রধান বিশ্লেষক রবার্ট এডওয়ার্ডস বলেন, ‘তামার বাজারে চীনের প্রভাব দীর্ঘদিন ধরেই কমবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল। তবে বৈদ্যুতিক যানবাহন, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও বিদ্যুৎ গ্রিডে বিনিয়োগের কারণে তা স্থায়ী হয়েছিল। এখন সেই প্রবণতা ধীরে ধীরে পরিবর্তন হচ্ছে।’

সিআরইউর পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৩০ সালে বৈশ্বিক খনি ও পুনর্ব্যবহৃত তামার ৫৭ শতাংশ থাকবে চীনের দখলে, যা ২০২৫ সালে ছিল ৫৯ শতাংশ।

আরও